No icon

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের গবেষণা, খরচাপাতি নিয়ে বোকা ভাবনা এবং কৌতূহল

আর রাজী। 

বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণার জন্য বরাদ্দ অতিঅল্প- এ কথা আমরা কমবেশি জানি। আর জানি, যুগের পর যুগ- এই গবেষণার জন্য বরাদ্দ-বৃদ্ধির দাবির কথা। এই দুই নিয়েই বোকা বোকা কিছু চিন্তা-ভাবনা-প্রশ্ন আমার মাথায় দীর্ঘদিন ধরে যন্ত্রণা করে, তারই কিছু আজ বলি।

এই লেখায় বিজ্ঞান শিক্ষকদের গবেষণা নিয়ে সরাসরি কিছু বলতে চাই না। কারণ সে এলাকা আমার অগম্য। কিন্তু কলা, সমাজবিদ্যা, আইন-বাণিজ্য -এসব নিয়ে  কিছু বলার কিঞ্চিত এখতিয়ার তৈরি হয়েছে বলে অনুমান করি। এই অনুমান পুরোই ভ্রান্ত হতে পারে, আংশিক সত্য হতে পারে আবার অনেক খানিই সত্য হতে পারে। কিন্তু যেহেতু এই এলাকায় আমার জীবন-যাপন সুতরাং দীর্ঘ্য অবস্থানের কারণেও কিছু এখতিয়ার তৈরি হয়ে যায়, সে দাবিতেই কিছু কথা আলোচনায় নিয়ে আসার তাগাদা বোধ করছি। যাই হোক, মূল কথায় যাই।

আমরা জানি, গবেষণার দু'টো দিক। একটা তত্ত্বীয় আর একটা প্রায়োগিক। প্রায়োগিক গবেষণা নিয়ে অন্য কোনো দিন, নিজের ভাবনার কথা বলবো কিন্তু তত্ত্বীয় গবেষণায়, সে বিজ্ঞান-কলা বা সমাজবিদ্যার তত্ত্বীয় গবেষণা হোক, তাতে টাকা-পয়সার বিশেষ বিনিয়োগ দরকার- এমন কথা কবুল করা দুরূহ। 

আচ্ছা, বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের তাত্ত্বিক গবেষণার হালহকিকত কী? জ্ঞানের কোন কোন কাণ্ডে-শাখায়-প্রশাখায় তারা বিশ্ব(বিদ্যালয়)-মানের তত্ত্ব দিয়েছেন, জানা আছে আপনার? আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের কী কী তত্ত্ব আছে, যা বিশ্বমানের? বিশ্বমানের বাদ দেন, বাংলাদেশের মালিক যে জনগণ, যাদের টাকায় তাদের বেতন হয়, তাদের কোনো সমস্যা বা তার সমাধান নিয়ে কোনো তাত্ত্বের কথা শুনিনি আমি। আপনি শুনেছেন? দেখেছেন কোনো তত্ত্বীয় কাজ যা দেশের কাজে এসেছে? দেশের মানুষ বুঝতে পারে- এমন কিছু আছে?

এ দেশে তত্ত্বীয় গবেষণার নামে যা হয়, সেগুলো পাওয়া যাবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রকাশনায়। আমি হলফ করে বলতে পারি, সেসব গবেষণা নিবন্ধের অধিকাংশ শিক্ষকরা তাদের নিজেদের শিক্ষার্থীদের হাতেও তুলে দিতে লজ্জা পান। অবশ্য, আজকাল এই লজ্জা বোধটুকুও দুর্লভ হয়ে উঠেছে!

বাদ দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকাশনা প্রসঙ্গ। এ দেশের সমস্যাগুলো নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ক'জনার বই-পুস্তক দেখেছেন? তারা নিশ্চয়ই এমন তত্ত্বই দেন যা মানুষের জীবন-সংশ্লিষ্ট। তাই যদি হয়, তাহলে এমন অনেক তত্ত্বীয় গবেষণাই মানুষের পরিচিত হওয়ার কথা। খুঁজে দেখন তো, তেমন তত্ত্বীয় গবেষণা গ্রন্থের হদিস মেলে কি না?

তত্ত্বীয় গবেষণা গ্রন্থও বাদ দেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের "অরজিনাল" চিন্তাভাবনা পাওয়া যায়, কিছুটা তাত্ত্বিক মনের পরিচয় পাওয়া যায়, এমন বই-পুস্তক কেমন আছে, খোঁজ করে দেখেন, মন ভেঙে যাবে।

যতটুকু কাণ্ডজ্ঞান আছে তাতে বুঝি, তাত্ত্বীয় গবেষণার ভিত্তিভূমির ওপরে গড়ে ওঠে প্রায়োগিক গবেষণার সৌধ। তত্ত্বীয় গবেষণার বালাই নাই, কীভাবে, কী নিয়ে, কেন প্রায়োগিক গবেষণা আপনি করবেন? কার জন্য করবেন?

আমার মনের মধ্যে একটা কথা প্রায়শই ঘাঁই মারে, পৃথিবীতে এমন কোনো তত্ত্বীয়-গবেষক কি আছেন, যিনি বলেন টাকার অভাবে তার গবেষণা কাজটি হয়নি? কিংবা এমন কোনো তাত্ত্বিক আছেন, যিনি টাকার জন্য গবেষণা করেছেন?

আমার ধারণা (ভুল হতে পারে অবশ্যই), গবেষণার কাজটা কবিতা লেখার মতোই মৌলিক। যিনি কবি, তিনি শত প্রতিকূলতার মধ্যেও কবিতা লিখে যাবেন, লিখবেনই। যিনি আদতেই গবেষক প্রবৃত্তি ধরেন, তিনি শত প্রতিকূলতা অতিক্রম করেও গবেষণা চালিয়ে যাবেন, নতুন নতুন তত্ত্ব নিয়ে হাজির হবেন, কোনো সমস্যা সমাধানের নতুন উপায় বের করবেন, কোনো গবেষণা-সমস্যা সমাধানের অভিনব, ব্যয়সাশ্রয়ী, লাগসই উপায় খুঁজে বের করবেনই করবেন।

একজন কবি যেমন শত প্রতিকূলতা অতিক্রম করে কবি হয়ে ওঠেন, একজন গবেষকও ঠিক সেভাবেই গবেষক হয়ে উঠেন। অর্থবিনিয়োগ করে যেমন কাউকে কবি বানানো যায় না, তেমনি গবেষকও বানানো যায় না। 

আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তো গবেষণা করার মন বা ধাঁচ আছে এমন মানুষদের নিয়োগই দেয় না, তাহলে গবেষণা করবে কে? আমরা যদি শেয়ালের পেট থেকে সিংহশাবক আশা করি, তা কি সঙ্গত হবে? আর শেয়ালের পেছনে বিনিয়োগ বাড়ালেই সিংহ তৈরি হয়ে যাবে? শেয়ালের পেট থেকে সিংহশাবক প্রত্যাশা করে দেশের মানুষ বিনিয়োগ বাড়াবে কেন?

আমার দেখা বাস্তবতা হচ্ছে, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষকদের জীবন-সাধনা হচ্ছে, উন্নত বিশ্বের তথ্য-উপাত্ত সরবরাহকারী হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া। বিদেশিদের ফরমাইশি তথ্য-উপাত্তের যোগানদাতা বা নিজের দেশের তথ্য-উপাত্ত পরদেশে সরবরাহকারীর পেছনে এই দেশের মানুষ কেন বিনিয়োগ করবে, সে প্রশ্ন কি অসঙ্গত হবে?

আর রাজী, সহকারী অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যাবিশ্ববিদ্যালয়।

Comment As:

Comment (0)